‘মব সন্ত্রাস’ আর কত মানুষের জীবন কেড়ে নিলে আমাদের বোধ জাগবে, হুঁশ হবে এই রাষ্ট্রের? রংপুরের ঘটনাটা দেখুন—নিজের মেয়ের বিয়ের কথাবার্তা বলার জন্য যাওয়া দরিদ্র এক বাবা ও তাঁর এক আত্মীয়কে ভ্যানচোর সন্দেহে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। নিহত রুপলাল দাস জুতা সেলাইয়ের কাজ করতেন, আর প্রদীপ দাস ভ্যান চালাতেন। দুই পরিবারের এখন চলছে আহাজারি।
ঘটনা হলো, মিঠাপুকুর উপজেলার শ্যামপুর এলাকার এক তরুণের সঙ্গে রুপলাল দাসের মেয়ে নুপুর দাসের বিয়ে নিয়ে কথাবার্তা চলছিল। রবিবার বিয়ের দিন–তারিখ ঠিক করার কথা ছিল। এ জন্য মিঠাপুকুর থেকে আত্মীয় রুপলাল দাসের বাড়ির উদ্দেশে ভ্যান চালিয়ে রওনা হন প্রদীপ দাস। পথ চিনতে না পেরে তিনি সয়ার ইউনিয়নের কাজীরহাট এলাকায় এসে রুপলালকে ফোন করেন। রুপলাল সেখানে গিয়ে দুজনে ভ্যানে চড়ে রওনা দেন। রাত ৯টার দিকে তারাগঞ্জ–কাজীরহাট সড়কের বটতলা এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় কয়েকজন তাঁদের থামিয়ে ভ্যানচোর সন্দেহে আটকে রাখে।
লোকজন জড়ো হলে একপর্যায়ে মারধর শুরু হয়। কয়েকদিন আগে ওই এলাকায় এক শিশুকে হত্যা করে ভ্যান চুরির ঘটনায় স্থানীয়রা ক্ষুব্ধ ছিলেন। ভ্যানে থাকা বস্তা থেকে চারটি বোতলে চোলাই মদ পেয়ে সন্দেহ আরও বাড়ে। এরপর তাঁদের বটতলা থেকে পেটাতে পেটাতে বুড়িরহাট উচ্চবিদ্যালয় মাঠে নিয়ে যাওয়া হয়। অচেতন হয়ে পড়লে সেখানেই ফেলে রাখা হয়।
রাত ১১টার দিকে পুলিশ তাঁদের উদ্ধার করে তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যায়। সেখানে চিকিৎসক রুপলাল দাসকে মৃত ঘোষণা করেন। প্রদীপ দাসকে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে সোমবার ভোরে তিনিও মারা যান। নিহত রুপলালের মা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘মোর ব্যাটা তো চোর নোয়ায়, জুতা সেলাই করে সংসার চালায়। ওর মেয়ের বিয়া ঠিক করার জন্য গেছিল, এইটাই কাল হইল।’ স্বামী হারিয়ে স্ত্রী ভারতী দাস অসহায় হয়ে পড়েছেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আতঙ্কে কাঁদছেন। বড় মেয়ে নুপুর দাস বলছে, ‘এ্যালা কয় হামাক দ্যাখপে… হামরা যে এতিম হইয়া গেইনো।’
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, গত ১০ মাসে (২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত) মব বা পিটিয়ে অন্তত ১৭৯ জনকে হত্যা করা হয়েছে। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। প্রশ্ন হলো, আর কত মানুষ মরলে হুঁশ হবে আমাদের?
রাষ্ট্রের এখন সর্বশক্তি দিয়ে মব হামলা বন্ধ করতে হবে। সরকারসহ সবাইকে প্রচার করতে হবে—কোনো সন্দেহ হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে তুলে দিন, কিন্তু কারো গায়ে হাত তুলবেন না। এটা ফৌজদারি অপরাধ। ধর্মও বলে, একজন মানুষকে হত্যা করা মানে গোটা পৃথিবীকে হত্যা করা, আর একজনকে বাঁচানো মানে গোটা পৃথিবীকে বাঁচানো।
দুঃখজনকভাবে মানবিক বোধের বদলে সমাজে ছড়িয়ে পড়ছে সহিংসতা, ঘৃণা ও বিদ্বেষ। অথচ শান্তি, সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ভালোবাসাই পারে এই দেশকে বাঁচাতে। সৃষ্টিকর্তা আমাদের মানবিক বোধ দিন—এই বোধ ছাড়া মুক্তির আর কোনো পথ নেই।


