24 C
Dhaka
Friday, January 16, 2026

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে শেষ মুহূর্তেও অনেক প্রশ্ন

advertisment
- Advertisement -spot_img

এক বছরের প্রচেষ্টা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আট মাসের সংলাপ শেষে রাষ্ট্র সংস্কারে চূড়ান্ত হয়েছে জুলাই জাতীয় সনদ–২০২৫। মঙ্গলবার রাতে এই চূড়ান্ত সনদ পাঠানো হয় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে।

আগামী শুক্রবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় বড় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর এই সনদে স্বাক্ষর করার কথা রয়েছে। তবে বাস্তবায়ন নিয়ে দলগুলোর মতপার্থক্যের কারণে শেষ মুহূর্তে সনদ স্বাক্ষরে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে।

সে কারণেই বুধবার সন্ধ্যায় প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন দলগুলোর প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসে।

রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো চূড়ান্ত সনদে দেখা গেছে—৮৪টি সংস্কার প্রস্তাবের মধ্যে অনেক বিষয়ে একমত হয়েছে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রস্তাবে ভিন্নমত জানানো হয়েছে, যেগুলো সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ হিসেবে যুক্ত করা হয়েছে।

তবে সনদে এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে আলাদা কোনো সুপারিশ রাখা হয়নি। যদিও অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে, “ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত যে সব সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য, সেগুলো দ্রুততম সময়ের মধ্যেই বাস্তবায়ন করবে অন্তর্বর্তী সরকার।”

সংস্কারের ৮৪টি সিদ্ধান্তকে দুটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে—
১. সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য ৪৭টি সিদ্ধান্ত
২. অধ্যাদেশ ও নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য ৩৭টি সিদ্ধান্ত

তবে সব দল শেষ পর্যন্ত সনদে সই করবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়। বাস্তবায়নে গণভোট করার বিষয়ে সবাই একমত হলেও ভোটের দিন ও পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে।

ঐকমত্য কমিশনের এক সদস্য জানিয়েছেন, সনদ বাস্তবায়নের রূপরেখা নির্ধারণ করবে অন্তর্বর্তী সরকার, তাই বাস্তবায়নসংক্রান্ত সুপারিশ সনদে যুক্ত করা হয়নি।


কোন কোন প্রস্তাবে ঐকমত্য হয়েছে

কয়েক মাসের সংলাপ শেষে চূড়ান্ত সনদে দেখা গেছে—

  • একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছর প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে পারবেন—এতে ৩০টি দল একমত।
  • ডেপুটি স্পিকার ও বিরোধী দল করার প্রস্তাবে একমত বিএনপি, জামায়াতসহ ৩১টি দল।
  • তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনর্বহালের পক্ষে একমত বিএনপি ও জামায়াতসহ ৩০টি দল।
  • নিজ দলের বিরুদ্ধে ভোট দেওয়ার সুযোগ (অর্থবিল ও আস্থা ভোট বাদে) সমর্থন করেছে ৩০টি দল।
  • রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা ও দায়িত্ব পুনর্নির্ধারণে ৩০টি দল ঐকমত্যে পৌঁছেছে (৯টি দলের ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আছে)।
  • রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি ও ক্ষমা প্রদর্শনের বিধানেও অধিকাংশ দল একমত।
  • সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব ১০০ আসনে উন্নীত করার প্রস্তাবেও সব দল একমত।
  • স্বাধীন পুলিশ কমিশন ও জনপ্রশাসন সংস্কার কমিটি গঠনে ৩০টি দল ঐকমত্যে পৌঁছেছে।
  • গণহত্যা ও ভোট জালিয়াতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে কমিশন গঠনের প্রস্তাবে একমত ৩২টি দল।

কোন কোন প্রস্তাবে ভিন্নমত রয়েছে

  • এক ব্যক্তি একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী, সংসদ নেতা ও দলীয় প্রধান হতে পারবেন না—এতে ২৫টি দল একমত হলেও বিএনপিসহ ৫টি দল নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে।
  • সংবিধান বিলুপ্তি ও স্থগিতের ক্ষমতা বিষয়ে ২৯টি দল একমত, ভিন্নমত গণফোরাম ও জাসদের।
  • সংসদের উচ্চকক্ষ পিআর পদ্ধতিতে গঠন—জামায়াত, এনসিপিসহ ২৩টি দল সমর্থন করলেও বিএনপিসহ ৭টি দল বিরোধিতা করেছে।
  • সংবিধানের মূলনীতি থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বাদ—এতে বিএনপি ও জামায়াতসহ ২৭টি দল একমত, তবে গণফোরাম ও জেএসডি ভিন্নমত জানিয়েছে।
  • ন্যায়পাল নিয়োগের প্রস্তাব—২৫টি দল একমত, ৫টি দল দ্বিমত।
  • নারীদের জন্য ৫% আসনে মনোনয়ন বাধ্যতামূলক—২৭টি দল একমত, তবে খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম ও ইসলামী আন্দোলন বিরোধিতা করেছে।

‘নোট অব ডিসেন্ট’ এর অবস্থান

চূড়ান্ত সনদে প্রতিটি প্রস্তাবের পাশে কোন কোন দল ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের একজন সদস্য জানান—

“যেসব দল কোনো প্রস্তাবে নোট অব ডিসেন্ট দিয়েছে, তারা ভবিষ্যতে ক্ষমতায় এলে সেই প্রস্তাব মানতে বাধ্য থাকবে না।”


সনদ সাক্ষর ও বাস্তবায়ন

শুক্রবারের অনুষ্ঠানে ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা জুলাই সনদে স্বাক্ষর করবেন। প্রতিটি দল থেকে দুইজন প্রতিনিধি এতে সই করবেন।
বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ দলগুলো ইতিমধ্যে তাদের প্রতিনিধির নাম পাঠিয়েছে।

তবে বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে শেষ মুহূর্তে কিছু দল সই থেকে বিরত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাই ঐকমত্য কমিশন সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া সরকারই নির্ধারণ করবে।


গণভোট কবে ও কিভাবে হবে

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে গণভোট আয়োজনের বিষয়ে সব দল একমত
ঐকমত্য কমিশনের সহসভাপতি আলী রীয়াজ বলেন—

“গণভোট হবে, তবে সময় ও প্রক্রিয়া নির্ধারণ করবে সরকার ও নির্বাচন কমিশন।”

সম্ভাবনা রয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনই গণভোট আয়োজন করা হবে। তবে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানায়নি।

নির্বাচন কমিশন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জাতীয় নির্বাচনের দিন গণভোট নিলে খরচ কমবে, তবে জনবল ও ভোটকক্ষের সংখ্যা বাড়াতে হবে।

গণভোটের সময় নিয়ে ভিন্নমতও রয়েছে—

  • বিএনপি চায় নির্বাচনের দিনই গণভোট হোক।
  • জামায়াত, এনসিপি ও ইসলামী আন্দোলন নির্বাচনের আগেই গণভোটের পক্ষে।

সবমিলিয়ে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এখনো ধোঁয়াশায়, যতক্ষণ না অন্তর্বর্তী সরকার গণভোট ও বাস্তবায়ন নিয়ে তাদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানাচ্ছে।

সর্বশেষ সংবাদ
- Advertisement -spot_img
আরও নিউজ