ফেব্রুয়ারিতে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ঢাকার ২৭৪টি ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে বিশেষ উন্নয়ন বরাদ্দ দিয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়। তবে বরাদ্দ পাওয়া এসব প্রতিষ্ঠানের ২৭৩টি রয়েছে ঢাকার মাত্র তিনটি আসনে—ঢাকা-০৯, ঢাকা-১০ এবং ঢাকা-১১। ঢাকায় মোট ২০টি সংসদীয় আসন থাকলেও শুধু তিনটিতে এ বরাদ্দ যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে।
বিবিসি বাংলা বরাদ্দ পাওয়া ২৭৪টি মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দির, শ্মশান ও কবরস্থানের অবস্থান বিশ্লেষণ করে দেখেছে—একটি ছাড়া বাকি সব প্রতিষ্ঠানই ঢাকা-০৯, ১০ ও ১১ নম্বর আসনে অবস্থিত।
এ তিন আসনে নির্বাচনকে সামনে রেখে এ ‘হঠাৎ বিশেষ বরাদ্দ’ নিয়ে চলছে নানা আলোচনা। বরাদ্দ পাওয়া ২৭৪টির মধ্যে অর্ধেকেরও বেশি—১৪৫টি প্রতিষ্ঠান—ঢাকা-১০ আসনের অন্তর্ভুক্ত ধানমন্ডি, কলাবাগান, হাজারীবাগ ও নিউমার্কেট এলাকায়।
ঢাকা থেকে নির্বাচন করার ঘোষণা দেওয়ার মাত্র সপ্তাহখানেক আগে স্থানীয় সরকার উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ঢাকা-১০ আসনের ভোটার হয়েছেন। প্রায় একই সময়ে তাঁর মন্ত্রণালয় থেকেই ওই আসনের মসজিদ, মাদ্রাসা, মন্দিরে বরাদ্দ দেওয়া হওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এ বরাদ্দ কার সুপারিশে?
এ প্রশ্নের উত্তরে আসিফ মাহমুদ দাবি করেছেন, কার সুপারিশে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে—তা তিনি জানেন না।
এদিকে, ঢাকার বাকি দুই আসন—ঢাকা-০৯ ও ঢাকা-১১—যেখানে ১২৮টি প্রতিষ্ঠান বরাদ্দ পেয়েছে, সেখান থেকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম ও এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম সদস্য সচিব তাসনিম জারা।
তাহলে কি ছাত্র উপদেষ্টা ও এনসিপি নেতারা যে আসনে নির্বাচন করছেন, শুধু সেই এলাকাগুলোকেই বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে? জবাবে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ বলেন—“বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার সময় তো শেষ হয়ে যায়নি। সারাদেশের অন্য অনেক জায়গায়ও বরাদ্দ গেছে।”
তবে নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী—তফসিল ঘোষণার পর এভাবে বরাদ্দ দেওয়া যায় না।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন—ভোটের আগে এ ধরনের বরাদ্দ নৈতিক প্রশ্ন তুলছে। স্থানীয় সরকার সংস্কার কমিশনের সদস্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন—“নির্বাচনের আগে কিছু আসনে বিশেষ বরাদ্দ নিঃসন্দেহে দৃষ্টিকটু।”
এর আগে গত ৫ অক্টোবর ঢাকার ১৪টি প্রতিষ্ঠানে ৪২ লাখ টাকার বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল, যা ছিল ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন এলাকায়—তাই নিয়ে তেমন প্রশ্ন ওঠেনি।
বিশেষ বরাদ্দ কীভাবে দেওয়া হয়?
২৭৩টি প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে অর্থ ছাড়ের চিঠি দেওয়া হয়েছে ঢাকা জেলা পরিষদকে। অর্থ ছাড়ের কাজও শুরু হয়েছে।
এডিপির আওতায় প্রতিবছর জেলা পরিষদের মাধ্যমে দেশের ধর্মীয়, সামাজিক ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সাধারণ ও বিশেষ বরাদ্দ দেয় সরকার। সাধারণত তিন লাখ টাকার মধ্যে বরাদ্দ দেওয়া হয় যাতে টেন্ডার ছাড়াই পরিচালনা কমিটি দিয়ে কাজ করা যায়।
স্থানীয় সরকার বিভাগের উপসচিব খোন্দকার ফরহাদ আহমদ জানান—বিশেষ বরাদ্দ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে থাকে। সারা দেশ থেকে আসা আবেদন ও চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ দেওয়া হয়।
আসিফ মাহমুদের ‘আসনেই’ অর্ধেকের বেশি বরাদ্দ
ঢাকা-১০ আসনে বরাদ্দ পেয়েছে মোট ১৪৫টি প্রতিষ্ঠান—পরিমাণ ৪ কোটি ৪৩ লাখ টাকা।
মোট ২৭৪টি প্রতিষ্ঠানের জন্য বরাদ্দ ৮ কোটি ২৯ লাখ টাকা।
আসিফ মাহমুদ ১০ নভেম্বর মুরাদনগর থেকে ভোটার এলাকা পরিবর্তন করে ঢাকা-১০ এর ভোটার হন। প্রায় একই সময়ে তাঁর মন্ত্রণালয় থেকেই তাঁর নির্বাচনী এলাকায় বিপুল বরাদ্দ—ফলে প্রশ্ন উঠছে।
প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন—
“সারাদেশেই তো বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে। আবেদনকারীদের প্রেক্ষিতে বরাদ্দ হয়। সব আবেদন খোঁজা সম্ভব নয়।”
আগামী মাসের শুরুতে তফসিল ঘোষণা হবে। ধারণা করা হচ্ছে—উপদেষ্টা পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে ঢাকা-১০ থেকে প্রার্থী হবেন আসিফ মাহমুদ।
স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ তারিকুল ইসলাম বলেন—
“সরকার যখন সংস্কার নিয়ে কাজ করছে, তখন এই ধরনের আসনভিত্তিক বরাদ্দ অনাকাঙ্ক্ষিত।”
এর আগে সেপ্টেম্বরে তাঁর গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগরের জন্য ৪৫৩ কোটি টাকার বরাদ্দ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছিল।
ঢাকা-৯ ও ঢাকা-১১ আসনে বরাদ্দ কেন?
কর্মকর্তাদের ভাষ্য—বরাদ্দ সাধারণত জনসংখ্যার ভিত্তিতে হয়। কিন্তু ঢাকায় ২০টি আসন থাকা সত্ত্বেও বরাদ্দ গেছে মাত্র ৩টিতে।
ঢাকা-১১ (বাড্ডা-রামপুরা) ও ঢাকা-০৯ (সবুজবাগ-খিলগাঁও) এলাকার ১২৮টি প্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ গেছে প্রতিটিতে ৩ লাখ টাকা করে—মোট ৩ কোটি ৮৪ লাখ টাকা।
এই দুই এলাকায়ই নির্বাচন করছেন নাহিদ ইসলাম ও তাসনিম জারা।
ঢাকা জেলা পরিষদ বলছে—বরাদ্দের কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে।
উপদেষ্টা আসিফের প্রতিক্রিয়া
এনসিপি নেতাদের সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে তিনি বলেন—
“কেউ যদি আবেদন না করে, তাহলে তো আমরা বরাদ্দ দিতে পারবো না। নিশ্চয় আবেদন ছিল।”
তিনি আরও জানান—কিছুদিনের মধ্যেই ঢাকাসহ অন্যান্য জায়গায় আরও বরাদ্দ দেওয়া হবে।
অধ্যাপক তারিকুল ইসলাম মনে করেন—
“উন্নয়ন বরাদ্দ যাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত না হয়—এর জন্য আমরা কমিশনে স্পষ্ট প্রস্তাব দিয়েছিলাম। তা বাস্তবায়িত হলে এমন সমস্যা হতো না।”
সূত্র: বিবিসি বাংলা


