মার্কিন সাংবাদিক জন রীডের সাড়া জাগানো গ্রন্থ ‘দুনিয়া কাঁপানো দশ দিন’। ১৯১৭ সালের বলশেভিক বিপ্লবের ওপর লেখা এই বইটিতে রাশিয়ার কমিউনিস্ট বিপ্লবের শেষ দশ দিনের শ্বাসরুদ্ধকর বর্ণনা রয়েছে। ৭ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর—এই দশ দিনের ঘটনাপ্রবাহই বইটির মূল উপজীব্য। বাংলাদেশের গত দশ দিন সারা দুনিয়া না কাঁপালেও, দেশের মানুষের জন্য বয়ে এনেছে আত্মবিশ্বাস ও ঐক্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
এই দশ দিনে বাংলাদেশ এক নতুন মেরুকরণের দিকে এগিয়ে গেছে। ২৫ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি—এই সময়টা বাংলাদেশের জন্য ছিল অভূতপূর্ব। শোক ও আশাবাদের এক যুগলবন্দি সময়। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবন শেষে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান।
এটি ছিল বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম বড় টার্নিং পয়েন্ট। নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা, ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরীফ ওসমান হাদির মৃত্যুর পর দেশজুড়ে দ্রুত অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি হয়। হাদির মৃত্যুর পর দেশব্যাপী তাণ্ডবে সরকার প্রবল চাপে পড়ে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে সাধারণ মানুষ হয়ে ওঠে উদ্বিগ্ন ও শঙ্কিত।
এমন পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন ছিল দেশের অনিশ্চয়তা ও অস্থিরতা দূর করার লক্ষ্যে একটি দৃঢ় পদক্ষেপ। নভেম্বরের শেষ দিকে বেগম খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় এভারকেয়ার হাসপাতালে ভর্তি হলে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্বশূন্যতা তীব্রভাবে অনুভূত হয়। তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনে সেই শূন্যতা পূরণ হয়। প্রিয় মাতৃভূমিতে ফিরে লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে প্রথম ভাষণেই তিনি ঐক্যের ডাক দেন।
বাংলাদেশ নিয়ে নিজের স্বপ্নের কথা বলেন তারেক রহমান। বিদ্বেষ ও প্রতিহিংসা পরিহার করে সামনে এগিয়ে যাওয়ার দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি। এর মধ্য দিয়েই দেশের মানুষ খুঁজে পায় এক নতুন কাণ্ডারি।
শুধু বাংলাদেশের জনগণ নয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ও তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে ইতিবাচকভাবে দেখেছে। প্রভাবশালী আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে তাকে ‘ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। তার আগমনের ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা অনেকটাই কেটে যায়। উজ্জীবিত বিএনপি জোরেশোরে নির্বাচনী প্রচারণা শুরু করে। পাশাপাশি অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচারণাও গতি পায়।
তারেক রহমানের দেশে ফেরার মাত্র পাঁচ দিনের মাথায়, বিদায়ী বছরের ৩০ ডিসেম্বর, বিএনপি চেয়ারপারসন ও আপসহীন নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় এই নেত্রীর মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় গোটা দেশ। অন্তর্বর্তী সরকার তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করে এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তার শেষকৃত্য সম্পন্ন করার সিদ্ধান্ত নেয়।
বেগম জিয়ার মৃত্যু সব ভেদাভেদ ভুলে বাংলাদেশকে ঐক্যবদ্ধ করে। বছরের শেষ দিনে তার জানাজায় স্মরণকালের সর্বাধিক মানুষের উপস্থিতিতে দেশ এক ঐতিহাসিক দিনের সাক্ষী হয়। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের ইতিহাসেও এত বিপুল সংখ্যক মানুষের অংশগ্রহণ বিরল ঘটনা। তার অন্তিম যাত্রায় কোটি মানুষের উপস্থিতি প্রমাণ করে—বাংলাদেশের মানুষ আসলে ঐক্যবদ্ধ। বেগম জিয়ার বিদায় দেশকে এক সুতোয় গেঁথে দেয়।
এই শোক শুধু সাধারণ মানুষকেই নয়, বিভক্ত রাজনৈতিক দলগুলোকেও কাছাকাছি নিয়ে আসে। বেগম জিয়ার মহাপ্রয়াণের পর তারেক রহমানকে সমবেদনা জানাতে যান জামায়াতের আমিরসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। এ ধরনের আচরণই রাজনীতিতে প্রত্যাশিত। দীর্ঘদিন নির্বাসিত থাকা রাজনৈতিক সৌজন্য ও শিষ্টাচার যেন আবার ফিরে আসে। মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় রাখাই সুস্থ রাজনীতির পরিচয়। বেগম জিয়ার বিদায়ের মুহূর্তে এই সৌজন্যতা ছিল তার প্রতি জাতির গভীর শ্রদ্ধারই বহিঃপ্রকাশ। এ ক্ষেত্রে তারেক রহমানের বিচক্ষণতা ও নেতৃত্ব বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
বেগম জিয়ার মৃত্যুতে শুধু বাংলাদেশ নয়, গোটা বিশ্ব শোক প্রকাশ করে। যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ৩২টি দেশের কূটনীতিকরা শেষ শ্রদ্ধা জানাতে উপস্থিত হন। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের ঢাকা সফর। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক ছিল সবচেয়ে শীতল অবস্থায়। বিশেষ করে ওসমান হাদির মৃত্যুর পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপোড়েন চরমে পৌঁছায়। রাষ্ট্রদূত তলবসহ পাল্টাপাল্টি কূটনৈতিক পদক্ষেপ উত্তেজনা বাড়ায়।
এমন সংকটময় সময়ে জয়শঙ্করের ঝটিকা ঢাকা সফর ছিল প্রচণ্ড শীতের মধ্যে এক টুকরো রোদের মতো। এটি বাংলাদেশের জন্য এক বড় স্বস্তির খবর। এই শোকাবহ সময়ে তারেক রহমান যেভাবে বিদেশি কূটনীতিকদের সঙ্গে সংলাপ ও আচরণ পরিচালনা করেছেন, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।
২৫ ডিসেম্বরের আগের বাংলাদেশ ও পরের বাংলাদেশের মধ্যে পার্থক্য আকাশ–পাতাল। আগের বাংলাদেশ ছিল ক্ষত-বিক্ষত ও বিভক্ত। মানুষ ছিল হতাশ ও উদ্বিগ্ন, রাজনৈতিক দলগুলো ছিল আক্রমণাত্মক ও মুখোমুখি অবস্থানে। দেশ ছিল গভীর অনিশ্চয়তায়। ২৫ ডিসেম্বর থেকে যেন নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা হয়। বিভক্ত জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়, রাজনৈতিক বিভাজনের দেয়াল ভাঙতে শুরু করে, কেটে যায় নির্বাচন নিয়ে সংশয়, কমে আসে অস্থিরতা।
গত দশ দিনে বাংলাদেশে এক নীরব বিপ্লব ঘটেছে। রাজনীতিতে এসেছে গুণগত পরিবর্তন। জনগণ ঐক্য ও সংহতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্ব দেখেছে এক নতুন বাংলাদেশ। একজন নেতার প্রত্যাবর্তন বদলে দিয়েছে একটি দেশকে।
নতুন বাংলাদেশের পথচলা—তাহলে কি শুরু হলো এখান থেকেই?


