গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে ছাত্র-জনতার বহুল প্রত্যাশিত ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ আজ (মঙ্গলবার) পাঠ করেছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। এই ঘোষণাপত্রে জুলাই আন্দোলনের শহীদদের ‘জাতীয় বীর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে, যা আন্দোলনকারীদের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল।
রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ে আয়োজিত ‘জুলাই পুনর্জাগরণ’ অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টা এই ঐতিহাসিক ঘোষণাপত্র পাঠ করেন।
ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের জনগণ এই অভিপ্রায় ব্যক্ত করছে যে, ছাত্র-গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর উপযুক্ত রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করা হবে এবং পরবর্তী নির্বাচনে নির্বাচিত সরকারের সংস্কারকৃত সংবিধানের তফসিলে এ ঘোষণাপত্র সন্নিবেশিত থাকবে। ৫ আগস্ট ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ী বাংলাদেশের জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন হিসেবে এই ঘোষণাপত্র প্রণয়ন করা হয়েছে।
ঘোষণাপত্রের ২৮টি মূল দফা:
১. মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা: ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশের জনগণের স্বপ্ন পূরণ হয়নি।
২. মানবিক রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা: সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র বিনির্মাণে জনগণের সর্বোচ্চ ত্যাগ।
৩. ১৯৭২ সালের সংবিধান: প্রণয়ন পদ্ধতির দুর্বলতা ও অপপ্রয়োগে জনগণের আকাঙ্ক্ষা বিনষ্ট।
৪. বাকশাল শাসন ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ: একদলীয় শাসনের প্রতিক্রিয়ায় ৭ নভেম্বর বিপ্লব, বহুদলীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রবর্তন।
৫. স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন: আশির দশকে সংগ্রামের মাধ্যমে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থান ও ১৯৯১ সালের সংসদীয় শাসন।
৬. ১/১১ ও আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র: দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে শেখ হাসিনার একচ্ছত্র ক্ষমতার উত্থান।
৭. সংবিধান পরিবর্তন ও একদলীয় আধিপত্য: ১৬ বছরের শাসনে গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ।
৮. রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ও দমন-পীড়ন: গুম-খুন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ এবং প্রতিষ্ঠান ধ্বংস।
৯. আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষয়: বাংলাদেশকে ফ্যাসিবাদী ও ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার অভিযোগ।
১০. অর্থনৈতিক দুর্নীতি ও পরিবেশ বিপর্যয়: উন্নয়নের নামে লুটপাট, অর্থ পাচার, ব্যাংক লুট।
১১. নিরবিচারে দমন: জনগণ ১৬ বছর ধরে দমন-পীড়ন সহ্য করে আন্দোলন চালিয়ে গেছে।
১২. বিদেশি প্রভুত্বের বিরুদ্ধে লড়াই: আওয়ামী লীগ সরকার বহিঃশক্তির প্রভাবে দেশের স্বার্থ বিকিয়ে দিয়েছে।
১৩. নির্বাচন প্রহসন: ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনকে প্রহসন আখ্যা।
১৪. ছাত্র-তরুণদের নিপীড়ন: ভিন্নমতের ওপর দমন, কোটাব্যবস্থার বৈষম্য।
১৫. জনরোষ ও বৈধ লড়াই: বিরোধী দলের ওপর নিপীড়ন জনরোষে রূপ নেয়।
১৬. বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন: সরকারি দমন-পীড়নে আন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়।
১৭. গণহত্যা ও সেনাবাহিনীর অবস্থান: এক হাজারের বেশি মানুষ নিহত, সেনাবাহিনীর গণ-আন্দোলনে সমর্থন।
১৮. অসহযোগ ও গণভবনমুখী লংমার্চ: শেখ হাসিনা ৫ আগস্ট ২০২৪-এ পদত্যাগ করে দেশ ছাড়ে।
১৯. গণঅভ্যুত্থান বৈধতা: অভ্যুত্থান রাজনৈতিক, আইনগত ও আন্তর্জাতিকভাবে বৈধ।
২০. অন্তর্বর্তীকালীন সরকার: ৮ আগস্ট ড. ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন।
২১. নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের আকাঙ্ক্ষা: ফ্যাসিবাদ, বৈষম্য ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্র গঠন।
২২. গণতান্ত্রিক সংস্কার: সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সংস্কারের ঘোষণা।
২৩. অপরাধের বিচার: গুম-খুন, মানবতাবিরোধী অপরাধের উপযুক্ত বিচার নিশ্চিতের প্রত্যয়।
২৪. জাতীয় বীর ও সুরক্ষা: আন্দোলনের শহীদদের জাতীয় বীর ঘোষণা ও পরিবার, আহতদের আইনি সুরক্ষা।
২৫. ভবিষ্যৎ নির্বাচন ও সংস্কার: দুর্নীতিমুক্ত, মানবাধিকারের ভিত্তিতে রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার।
২৬. জলবায়ু ও টেকসই উন্নয়ন: পরিবেশ, জলবায়ু সহিষ্ণু উন্নয়ন কৌশলের প্রতিশ্রুতি।
- সাংবিধানিক স্বীকৃতি: জুলাই অভ্যুত্থানকে সংবিধানের তফসিলে যুক্ত করার ঘোষণা।
- প্রণয়নের উদ্দেশ্য: ৫ আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে বিজয়ী জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।


