জয় বাংলা ব্রিগেডের জুম মিটিংয়ে অংশ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারকে উৎখাত ও রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২৮৬ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় অভিযোগ গঠনের নতুন তারিখ নির্ধারণ করেছেন আদালত। আগামী ২১ জানুয়ারি অভিযোগ গঠনের দিন ধার্য করা হয়েছে।
সোমবার (৫ জানুয়ারি) ঢাকার বিশেষ জজ আদালত-৯ এর বিচারক আব্দুস সালামের আদালতে এ মামলার অভিযোগ গঠনের শুনানির দিন ছিল। তবে মামলার ১৬ নম্বর আসামি আদালতে উপস্থিত না থাকায় অভিযোগ গঠনের তারিখ পিছিয়ে দেওয়া হয়। অনুপস্থিত ওই আসামির আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাইফুল্লাহ আল মামুন জানান, মামলার তিনজন আসামি অন্য মামলায় কারাগারে থাকায় উপস্থিত করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে আদালত অভিযোগ গঠনের শুনানি পিছিয়েছেন।
সকাল ১১টায় অভিযোগ গঠন শুনানির জন্য আদালত বসে। শুনানি শুরু হলে হাজতখানা থেকে আসামিদের আনতে বিলম্ব হওয়ায় রাষ্ট্রপক্ষ বিষয়টি আদালতের নজরে আনে। পরে তিন ধাপে মোট ২৬ জন আসামিকে আদালতে হাজির করা হয়।
রাষ্ট্রপক্ষে ঢাকা মহানগর পাবলিক প্রসিকিউটর অ্যাডভোকেট ওমর ফারুক ফারুকী অভিযোগ গঠনের পক্ষে শুনানি করেন। এ ছাড়া রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী (এপিপি) অ্যাডভোকেট সাইফুল্লাহ আল মামুনও অভিযোগ গঠনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন।
অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা পৃথকভাবে জামিন ও অব্যাহতির আবেদন করেন। তারা দাবি করেন, মামলাটি সঠিক আইনি ধারায় হয়নি। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযোগগুলো সাইবার ক্রাইম আইনের আওতাভুক্ত হলেও দণ্ডবিধির বিভিন্ন ধারায় মামলা করা হয়েছে, যা আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয়।
আসামি আক্তারুজ্জামানের আইনজীবী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম আদালতে বলেন, “আপনি একজন ন্যায়বিচারক। আপনার কাছেই আমরা ন্যায়বিচার প্রত্যাশা করি। সাইবার অপরাধ হলে সাইবার আইনে বিচার হবে, একই ঘটনায় দুইভাবে শাস্তির বিধান নেই।” তিনি আরও বলেন, মামলায় ৬৮ জন আসামি অনুপস্থিত ছিলেন, যারা জুম মিটিংয়েও অংশ নেননি।
সাবেক সংসদ সদস্য সাবিনা আক্তার তুহিনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোরশেদ হোসেন শাহীন বলেন, মামলাটি সংশ্লিষ্ট ধারায় না করে ভিন্ন ধারায় দায়ের করা হয়েছে। জুম মিটিংয়ে কোনো সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড হয়নি। এটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা দাবি করে তিনি আসামির জামিন চান।
আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আরও বলেন, মামলায় ৫২ বছর বয়সী এক নারী রয়েছেন, যিনি মোবাইল ফোন ব্যবহার করতেই অক্ষম—জুম মিটিংয়ে অংশ নেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। তিনি অসহায় ও দরিদ্র; কোথাও সম্পৃক্ত ছিলেন না বলে জামিনের আবেদন জানানো হয়।
আসামি বাবুল আহমেদের আইনজীবী বলেন, তার মক্কেল একজন পঙ্গু কৃষক, যার কোনো রাজনৈতিক পদ-পদবি নেই। এজাহারে নাম না থাকা সত্ত্বেও বাসা থেকে ধরে এনে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে। চার মাস ধরে তিনি কারাগারে রয়েছেন—তার জামিন প্রাপ্য।
এর আগে গত ১১ নভেম্বর ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইশরাত জেনিফার জেরিন মামলাটি বিচারযোগ্য মনে করে তা বদলির আদেশ দেন। পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রমের জন্য মামলাটি ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতে স্থানান্তর করা হয়।
এ মামলায় সাবেক এমপি সাবিনা আক্তার তুহিনসহ ২৮ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। গ্রেপ্তার দেখানো অন্যান্য উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মো. ইব্রাহীম খলিল বিপুল, মো. আব্দুস সবুর, মোছা. ছানোয়ারা খাতুন, মেহেদী হাসান আকাশ, এ কে এম আক্তারুজ্জামান, কে এম রাশেদ, মোছা. মেরিনা খাতুন মেরি, সুশান্ত ভৌমিক, নিজাম বারী, জাহাঙ্গীর আলম, শেখ আনিচুজ্জামান আনিচ, মো. আকরামুল আলম, মো. নুর উন নবী মণ্ডল দুলাল মাস্টার্স, মো. সাইফুল ইসলাম সর্দার, কাজী আবুল কালাম, মোছা. ফেন্সী, কে এম শাহ নেওয়াজ ওরফে শিবলু, রফিকুল ইসলাম, জিন্নাত সুলতানা ঝুমা, মেহেদী হাসান ঈশান ও জনি চন্দ্র সূত্রধর।
মামলার অভিযোগে বলা হয়, গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর একটি অনলাইন জুম মিটিংয়ের মাধ্যমে ‘জয় বাংলা ব্রিগেড’ গঠন করে গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে পলাতক শেখ হাসিনাকে পুনরায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনার ষড়যন্ত্র করা হয়। ওই মিটিংয়ে দেশ-বিদেশ থেকে ৫৭৭ জন অংশগ্রহণকারী শেখ হাসিনার সব নির্দেশ পালনের অঙ্গীকার করেন।
যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ড. রাব্বি আলমের হোস্টিংয়ে অনুষ্ঠিত ওই জুম মিটিংয়ের ভয়েস রেকর্ড বিশ্লেষণে দেখা যায়, অংশগ্রহণকারীরা বৈধ সরকারকে শান্তিপূর্ণভাবে দেশ পরিচালনা করতে না দেওয়ার আলোচনা করেন এবং বর্তমান সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে গৃহযুদ্ধের ঘোষণা দেন।
এসব কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রদ্রোহের সুস্পষ্ট উপাদান পাওয়া যাওয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ সিআইডির সহকারী পুলিশ সুপার মো. এনামুল হক শেখ হাসিনাসহ ৭৩ জনের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের করেন। পরে তদন্ত শেষে ১৪ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ মোট ২৮৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়।
আদালত অভিযোগপত্র গ্রহণ করে সব আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। একই সঙ্গে গত ১১ সেপ্টেম্বর আসামিদের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।
মামলার উল্লেখযোগ্য আসামিদের মধ্যে আরও রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ড. রাব্বি আলম, জয় বাংলা ব্রিগেডের সদস্য কবিরুল ইসলাম, এলাহী নেওয়াজ মাছুম, জাকির হোসেন জিকু, প্রফেসর তাহেরুজ্জামান, সাবেক এমপি সৈয়দ রুবিনা আক্তার, সাবেক এমপি পংকজ নাখ, ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাদ্দাম হোসেন, নুরুন্নবী নিবির, সাবিনা বেগম ও শরিফুল ইসলাম রমজান।


