দক্ষিণ এশিয়ায় সার্কের অচলাবস্থার সুযোগ নিয়ে ভারতকে বাদ দিয়ে নতুন আঞ্চলিক জোট গড়ার উদ্যোগ নিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির উপপ্রধানমন্ত্রী ইশহাক দার জানিয়েছেন, বাংলাদেশ–পাকিস্তান–চীনকে কেন্দ্র করে প্রস্তাবিত ত্রিদেশীয় উদ্যোগটি ভবিষ্যতে আরও দেশকে যুক্ত করে বড় আকারের আঞ্চলিক কাঠামোতে রূপ দেওয়া যেতে পারে।
“সহযোগিতা চাই, সংঘাত নয়” — পাকিস্তান
বুধবার (৩ ডিসেম্বর) ইসলামাবাদ কনক্লেভ ফোরামে দার বলেন, পাকিস্তান লাভবান হতে গিয়ে অন্যের ক্ষতি চায় না। অভিন্ন উন্নয়ন ও সহযোগিতাকেই তারা অগ্রাধিকার দেয়। তিনি ইঙ্গিত দেন— ভারতের কারণে সার্ক দীর্ঘদিন স্থবির থাকায় বিকল্প জোটের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, “আমাদের জাতীয় উন্নয়ন কখনো কারও অনমনীয়তার কাছে জিম্মি হওয়া উচিত নয়। আপনারা জানেন, আমি কাদের কথা বলছি।”
সার্কের অচলাবস্থা থেকে নতুন জোটের ভাবনা
১৯৮৫ সালে গঠিত সার্ক ভারত–পাকিস্তানের বৈরী সম্পর্কের কারণে কার্যত অচল। ২০১৬ সালে ইসলামাবাদে হতে যাওয়া সার্ক শীর্ষ সম্মেলন ভারত বয়কট করায় সংগঠনটি কার্যক্রমে থমকে যায়।
দক্ষিণ এশিয়ার জনসংখ্যা ২০০ কোটির বেশি হলেও এ অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য মাত্র পাঁচ শতাংশ। বিশেষ করে ভারত–পাকিস্তান বাণিজ্য প্রায় অকার্যকর— ২০২৪ সালে সরাসরি বাণিজ্য হয়েছে মাত্র ১.২ বিলিয়ন ডলার।
বাংলাদেশ–চীন–পাকিস্তান ত্রিপক্ষীয় বৈঠকের প্রেক্ষাপট
গত জুনে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের, চীনের ও পাকিস্তানের কূটনীতিকরা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও উন্নয়ন বিষয়ক বৈঠক করেন। যদিও তখন বলা হয়েছিল— এটি “তৃতীয় কোনো দেশকে লক্ষ্য করে নয়”।
বর্তমান উত্তেজনা—
• ভারত–পাকিস্তান মে মাসে চারদিনের যুদ্ধে জড়ায়
• গণআন্দোলনের পর বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কও সংকটপূর্ণ
• মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ায় দুই দেশের সম্পর্ক তলানিতে
এই প্রেক্ষাপট পাকিস্তানের প্রস্তাবকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: প্রস্তাব কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা কত?
“উচ্চাকাঙ্ক্ষী, তবে প্রয়োজনীয়”
বাংলাদেশ সেন্টার ফর ইন্দো–প্যাসিফিক অ্যাফেয়ার্সের শাবাব ইনাম খান মনে করেন— পাকিস্তানের উদ্যোগ উচ্চাকাঙ্ক্ষী হলেও দক্ষিণ এশিয়ার ব্যর্থ আঞ্চলিক বাস্তবতায় এ ধরনের কাঠামো জরুরি।
“সার্কের ব্যর্থতায় নতুন জায়গা তৈরি হয়েছে”
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক প্রবীণ দোন্থি বলেন, সার্কের ‘নীরব মৃত্যু’ নতুন জোটের পথ খুলেছে। বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক খারাপ হওয়া ও পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পাওয়ায় চীনকে যুক্ত করে ত্রিদেশীয় সহযোগিতা সম্ভব হতে পারে।
“তবে বাস্তবে কঠিন” — রাবেয়া আক্তার
লাহোর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাবেয়া আক্তারের মতে, রাজনৈতিক বাস্তবতা ভিন্ন চিত্র দেখায়।
• দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রগুলো বিষয়ভিত্তিক ছোট আকারের সহযোগিতায় আগ্রহী হতে পারে
• কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তানের নতুন জোটে যোগ দেওয়ার ঝুঁকি নিতে তারা চাইবে না
• বিশেষত ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হওয়ার ভয় থেকেই যাবে
সম্ভাব্য ভূরাজনৈতিক প্রভাব
প্রস্তাব সফল হলে—
• ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও উত্তপ্ত হতে পারে
• ভারত–চীন প্রতিযোগিতা বাড়বে
• দক্ষিণ এশিয়ার শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে সাজতে পারে
তবে বেশিরভাগ বিশ্লেষক মনে করেন— রাজনৈতিক উত্তেজনা, বিশ্বাসের ঘাটতি এবং ভারতের প্রভাব-রাজনীতির কারণে এ উদ্যোগের বাস্তবায়ন এখনই খুব সহজ নয়।


