জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বৈঠকে অংশ নিয়ে ‘জুলাই সনদ’ চূড়ান্ত করতে এবং এটিকে আইনি ভিত্তি দিতে গণভোট আয়োজনের দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির পক্ষ থেকে আরও প্রস্তাব করা হয়েছে, কেউ যেন ১০ বছরের বেশি সময় প্রধানমন্ত্রী পদে থাকতে না পারেন এবং একই ব্যক্তি যেন একসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান হতে না পারেন।
রোববার (১৮ মে) জাতীয় সংসদের এলডি হলে অনুষ্ঠিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে বর্ধিত আলোচনায় এসব প্রস্তাব তুলে ধরে জামায়াত। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের।
তিনি বলেন, “যেসব বিষয়ে ঐকমত্য হবে বা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— এমন বিষয়গুলো নিয়ে কীভাবে আইনগত ভিত্তি দেওয়া যায়, তা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। জামায়াতের পক্ষ থেকে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, আমরা গণভোট চাই। কারণ গণভোট হচ্ছে জনগণের মনের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে সাধারণ মানুষই সিদ্ধান্ত নেবেন এবং এতে একটি আইনগত ভিত্তি তৈরি হবে।”
বিতর্কিত নির্বাচনে শাস্তির বিধান চান
বৈঠকের বিরতিতে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ডা. তাহের বলেন, “বিগত ১৫ বছর বা তার আগেও নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব ছিল সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজন করা। কিন্তু অনেক সময় তারা সেই দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করেনি। এর কারণ হচ্ছে— বিদ্যমান আইনে কমিশনারদের ত্রুটি-বিচ্যুতির জন্য কার্যকর শাস্তির বিধান নেই।”
জামায়াতের প্রস্তাব, নির্বাচন কমিশনারদের দায়িত্বে অবহেলার জন্য চাকরিচ্যুতি, এমনকি অবসরের পরেও যেন তাদের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধান থাকে। এজন্য আইনের সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হয়।
দুদকের ওপর নজরদারি করতে টাস্কফোর্স
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) নিয়ে প্রস্তাবনায় জামায়াত বলেছে, “দুদক অনেক সময় দুর্নীতিগ্রস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত হয়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসতে হলে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে, যারা দুদকের ওয়াচডগ হিসেবে কাজ করবে। দুদকের কেউ দুর্নীতিতে জড়ালে সেই টাস্কফোর্স শাস্তির সুপারিশ করবে।”
জামায়াত দাবি করে, এই প্রস্তাবে ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরাও একমত হয়েছেন।
ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও প্রধানমন্ত্রিত্বে সময়সীমা
ক্ষমতার ভারসাম্য আনার লক্ষ্যে জামায়াত বলেছে, “এক ব্যক্তি যেন একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী ও দলের প্রধান না হতে পারেন। পৃথিবীর অনেক দেশেই এমন ব্যবস্থা রয়েছে। এছাড়া, কেউ যেন সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারেন, সেটাও আমরা প্রস্তাব করেছি।”
জাতীয় সাংবিধানিক কাউন্সিল (এনসিসি) গঠন নিয়ে মত
এনসিসি গঠনের বিষয়ে জামায়াত নীতিগতভাবে একমত হলেও, এর কাঠামোতে কিছু সংশোধনী চায়। প্রধান বিচারপতি ও রাষ্ট্রপতিকে এনসিসির বাইরে রাখার প্রস্তাব দিয়ে তাহের বলেন, “তাদের নিরপেক্ষ অবস্থান বজায় রাখতে হবে, যাতে সংকটকালে জনগণ সমাধানের জন্য তাদের শরণাপন্ন হতে পারে।”
আলোচনা ও আগামী পদক্ষেপ
ঐকমত্য কমিশনের সঙ্গে আলোচনায় জামায়াতের ১১ সদস্যের প্রতিনিধি দলে ছিলেন— ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাসুম, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল রফিকুল ইসলাম খান, হামিদুর রহমান আজাদ, এহসান মাহবুব যোবায়ের প্রমুখ।
কমিশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন সহসভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ, সদস্য বিচারপতি মো. এমদাদুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, সফর রাজ হোসেন, ড. ইফতেখারুজ্জামান, মো. আইয়ুব মিয়া ও প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, “দ্রুততম সময়ের মধ্যে একটি জাতীয় সনদ তৈরির লক্ষ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে প্রাথমিক পর্যায়ের আলোচনা সম্পন্ন করে শিগগিরই দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরু হবে।”


