বাংলাদেশ নারী ফুটবলের অন্যতম উজ্জ্বল মুখ, রাঙামাটির মগাছড়ি গ্রামের তরুণী ঋতুপর্ণা চাকমা। কেউ বলেন ‘পাহাড়ি রাজকন্যা’, কারও চোখে তিনি লাল-সবুজের মেসি। ২১ বছর বয়সী এই উইঙ্গার সদ্য শেষ হওয়া এএফসি উইমেন্স এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বে মিয়ানমারে দারুণ পারফরম্যান্সে পাঁচ গোল করে দেশের নারী ফুটবলে একটি স্বপ্নের পথ খুলে দিয়েছেন—অস্ট্রেলিয়ায় হতে যাওয়া এশিয়ান কাপে অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছেন।
কিন্তু মাঠের সাফল্যের বাইরেও ঋতুপর্ণা একজন সাহসী কন্যা, যিনি একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে পড়ছেন, অন্যদিকে লড়ছেন জীবনের নানা প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে—বিশেষ করে ক্যানসার আক্রান্ত মায়ের চিকিৎসার ভার নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন তিনি।
ছোটবেলায় পাহাড়ি ছেলেদের সঙ্গে খেলতে খেলতে ফুটবলের প্রেমে পড়া ঋতু প্রথম আলো দেখতে পান মগাছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বীরসেন চাকমার উৎসাহে। তিনি বুঝতে পারেন, এই ছোট মেয়েটির পায়ে লুকিয়ে আছে ভিন্ন এক প্রতিভা। শুরু হয় একটি স্বপ্নের যাত্রা—বঙ্গমাতা প্রাথমিক টুর্নামেন্ট, বিকেএসপিতে ভর্তি, বাফুফের জুনিয়র ক্যাম্পে ডাক এবং অবশেষে জাতীয় দলে নাম লেখানো।
ঋতুপর্ণা ইতোমধ্যেই দুটি সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতেছেন, সর্বশেষটিতে হয়েছেন সেরা খেলোয়াড়। কিন্তু মাঠের জয় ছাপিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছেন তিনি তার মানবিক সংগ্রাম দিয়ে। ১১ বছর আগে ক্যানসারে বাবাকে হারানোর পর এখন মায়ের চিকিৎসার পুরো দায়ভার একাই বহন করছেন। ইতোমধ্যে মা ভুজোপতি চাকমা তিনটি কেমোথেরাপি নিয়েছেন, চট্টগ্রামে নিয়মিত চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।
কঠিন এ বাস্তবতায়ও ভেঙে পড়েননি ঋতু। বরং এশিয়ান কাপে জায়গা পাওয়ার পর মাকে ফোন করে জানানোর মুহূর্তটাই যেন ছিল তার জীবনের অন্যতম আনন্দঘন স্মৃতি। মা বলেছিলেন, ‘তোমার সাফল্য দেখে এখন আর অসুস্থ লাগছে না।’
ঋতুপর্ণা তার পরিবারে এখন মূল ভরসা। একমাত্র ভাই পার্বণ চাকমাকে হারিয়েছেন তিন বছর আগে। তিন বোন ইতোমধ্যে বিবাহিত। এখন সংসার চালানো, নিজের পড়াশোনা, ফুটবল ক্যারিয়ার—সব একসাথে সামলাচ্ছেন তিনি।
ঋতুপর্ণার গল্প শুধু একজন প্রতিভাবান খেলোয়াড়ের নয়, একজন সংগ্রামী নারীর গল্প—যিনি ফুটবল মাঠের গণ্ডি পেরিয়ে জীবনের রুক্ষ পথেও জয়ী। পাহাড়ের মেয়ে হিসেবে যাত্রা শুরু করা এই তরুণী আজ জাতীয় অনুপ্রেরণা, যার স্বপ্ন এখন বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ানো।


