দেশের ব্যাংক খাতে সৃষ্টি হওয়া মন্দ ঋণের পরিমাণ এতটাই বড় যে তা দিয়ে ১৪টি মেট্রোরেল এবং ২৪টি পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব ছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে ব্যাংক খাতের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছে। নামে-বেনামে ঋণ গ্রহণ, বিদেশে অর্থ পাচার এবং জোরপূর্বক ব্যাংকের মালিকানা পরিবর্তনের মতো ঘটনা এই খাতের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসনকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে এনেছে। যার চড়া মূল্য দিচ্ছে শুধু ব্যাংক নয়, পুরো দেশ।
রবিবার (১ ডিসেম্বর) অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে একটি বিশেষ প্রতিবেদন হস্তান্তর করে কমিটির প্রধান ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য। প্রতিবেদনে উঠে আসে, গত ১৫ বছরে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত খাত হলো ব্যাংক। মন্দ ঋণ এবং খেলাপি ঋণের আকাশচুম্বী পরিমাণ ব্যাংক খাতকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
২০২৩ সালের জুন শেষে দেশের মোট খেলাপি ঋণ দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ১১ হাজার ৩৯১ কোটি টাকা। এছাড়াও পুনঃতফসিল ও পুনর্গঠনকৃত ঋণ রয়েছে ২ লাখ ৭২ হাজার ৮৫৬ কোটি টাকার সমান। অবলোপিত ঋণের স্থিতি ৭৫ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা, এবং বিভিন্ন আদালতের স্থগিতাদেশে খেলাপিমুক্ত ছিল ৭৬ হাজার ১৮৫ কোটি টাকার ঋণ। এই সমস্ত পরিসংখ্যান যোগ করলে জুন শেষে মন্দ ঋণের পরিমাণ দাঁড়ায় ৬ লাখ ৭৫ হাজার ৩০ কোটি টাকা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংক খাতের দুর্নীতির মূল কারণ ঋণ কেলেঙ্কারি, প্রতারণা এবং ভুয়া ঋণ। অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় মদদে ব্যাংক দখল বা অর্থ লুটপাট করা হয়েছে। এই অর্থের বড় একটি অংশ বিদেশে পাচার হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালের পর থেকে এস আলম গ্রুপ এবং আরও কিছু বড় গ্রুপ ব্যাংক থেকে বড় অংকের ঋণ নিয়ে তা পাচার করেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, “বর্তমানে খেলাপি ঋণের হার সাড়ে ১২ শতাংশ হলেও, তা আগামীতে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। ইতোমধ্যে আমরা খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমাতে কাজ শুরু করেছি। তবে সামনের দিনগুলোতে বড় গ্রুপগুলোর ঋণ সমস্যা আরও প্রকট হবে।”
প্রতিবেদন প্রকাশের সময় আরও উপস্থিত ছিলেন অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ, মুখ্য সচিব সিরাজ উদ্দিন সাথী এবং সিনিয়র সচিব লামিয়া মোর্শেদ। তারা ব্যাংক খাতের শুদ্ধি কার্যক্রম এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেন।
ব্যাংক খাতের এই অবস্থার জন্য জবাবদিহিতার অভাব, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা দায়ী বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা। মন্দ ঋণের এই বিশাল পরিমাণ শুধু দেশের আর্থিক খাতকেই ক্ষতিগ্রস্ত করেনি, বরং পুরো অর্থনীতিকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। এজন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।


