জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, দ্রব্যমূল্যের অস্বাভাবিক ঊর্ধ্বগতির পেছনে মূলত দুটি দুষ্টচক্র দায়ী—একটি চাঁদাবাজি, অন্যটি সিন্ডিকেট। তিনি বলেন, “আমরা আপনাদের কথা দিচ্ছি, আল্লাহ যদি আমাদের সুযোগ দেন, তাহলে প্রথমেই চাঁদাবাজদের হাত শক্ত করে ধরে ফেলব। এরপর সিন্ডিকেট ভেঙে চুরমার করে দেব। কোথাও কোনো সিন্ডিকেটের অস্তিত্ব রাখা হবে না। শাসন হবে জনগণের শাসন।”
মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) সাতক্ষীরা জেলা জামায়াতের আয়োজনে সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের মাঠে অনুষ্ঠিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা জামায়াতে ইসলামীর বিজয় চাই না, আমরা চাই ১৮ কোটি মানুষের বিজয়। ১৮ কোটি মানুষ মুক্ত হলে আমরাও মুক্ত। আর তারা যদি বিপদে পড়ে, আমরাও বিপদে পড়ব।”
তিনি বলেন, সামনে দুটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে—একটি গণভোট, অন্যটি সাধারণ নির্বাচন। “গণভোটে ‘হ্যাঁ’ মানে আজাদি, আর ‘না’ মানে গোলামি। আপনারাই বলুন—গোলামি না আজাদি? ইনশাআল্লাহ, এ দেশের মানুষ আজাদিই চায়। আমাদের যুবসমাজ আজাদি চায়। তারা বুক পেতে দিয়ে লড়াই করে প্রমাণ করেছে, অন্যায়, দানবীয় শক্তি কিংবা আধিপত্যবাদের কাছে বাংলাদেশের যুবসমাজ কখনো মাথা নত করবে না।”
সাতক্ষীরার উন্নয়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সাতক্ষীরাকে সাড়ে ১৫ বছর ধরে বঞ্চিত রাখা হয়েছে, সৎ মায়ের সন্তানের মতো আচরণ করা হয়েছে। আমরা আপনাদের কাছে আহ্বান জানাই—সাতক্ষীরার চারটি আসন যদি আপনারা আমাদের উপহার দেন, তাহলে ন্যায় ও ইনসাফ কায়েম, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা এবং মদিনার শাসনামলের মতো সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সর্বাত্মক চেষ্টা করব। আপনাদের সমস্যাগুলো আপনাদের সঙ্গেই আলোচনা করে সমাধান করা হবে, ওপর থেকে কিছুই চাপিয়ে দেওয়া হবে না।”
তিনি আরও বলেন, “আল্লাহ যদি তার মেহেরবানিতে সরকার গঠনের সুযোগ দেন, তাহলে কোনো শিক্ষিত চোরের হাতও আপনাদের কোনো অংশ খেয়ে ফেলতে পারবে না। আমরা কাউকে খেতে দেব না।”
দেশের সম্পদ পাচার প্রসঙ্গে জামায়াত আমির বলেন, “এই দুঃখী দেশের সম্পদ লুট করে কিছু রাজনৈতিক দুর্বৃত্ত বিদেশে টাকা পাচার করেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে যার ডকুমেন্টস আছে ২৮ লাখ কোটি টাকা। আর যেগুলোর ডকুমেন্টস নেই, তার কোনো হিসাব নেই। আমরা দেশবাসীকে কথা দিচ্ছি—আল্লাহ আমাদের সুযোগ দিলে ওদের পেটের ভেতর হাত ঢুকিয়ে আপনাদের সম্পদ বের করে আনব। এই বিষয়ে কোনো দয়া, কোনো ক্ষমা নেই। আমরা কঠোর ও আপসহীন।”
তিনি বলেন, “ভবিষ্যতের বার্তা স্পষ্ট। যেদিন এই সরকার শপথ নেবে, অতীতের হিসাব পরে দেখা যাবে, কিন্তু সেদিন থেকে কেউ আর কালো টাকার দিকে হাত বাড়াতে পারবে না। সব শ্রেণি ও পেশার রাষ্ট্রের সেবক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার পরিবেশ তৈরি করা হবে। ঝুঁকিপূর্ণ পেশায় নিয়োজিতদের জন্য থাকবে আলাদা বেতন কাঠামো।”
নির্বাচন প্রসঙ্গে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আগামী ১২ তারিখে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে এবং দুটি ভোট দেওয়া হবে। “সারা বাংলাদেশে ন্যায় ও ইনসাফের পক্ষে, পরিবর্তনের পক্ষে, দুর্নীতির বিপক্ষে, ফ্যাসিবাদের ও জুলুমতন্ত্রের বিপক্ষে জনমত তৈরি হয়েছে। মা-বোনদের বেইজ্জতির বিপক্ষে এবং সম্মান প্রতিষ্ঠার পক্ষে মানুষ রায় দেবে।”
তিনি বলেন, “বাংলাদেশের যুবকরা ইতোমধ্যে রায় দিয়ে জানিয়েছে—আমরা ইনসাফ ও পরিবর্তনের বাংলাদেশের পক্ষে। দেশের পাঁচটি সর্ববৃহৎ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাই তার প্রমাণ দিয়েছে।”
যুবসমাজের উদ্দেশে তিনি বলেন, “আমরা তোমাদের হাতে বেকার ভাতা তুলে দিতে চাই না। আমরা চাই তোমাদের হাতকে দেশ গড়ার কারিগরের হাতে পরিণত করতে। সম্মানের কাজ সৃষ্টি করে সেই কাজ তোমাদের হাতে তুলে দিতে চাই, যেন তোমরা গর্বের সঙ্গে বলতে পারো—আমরা এই দেশের গর্বিত নাগরিক।”
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে ডা. শফিকুর রহমান সাতক্ষীরার চারটি সংসদীয় আসনে ১১ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেন।
সাতক্ষীরা-১ আসনে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ মুহাম্মদ ইজ্জত উল্লাহ, সাতক্ষীরা-২ আসনে কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সেক্রেটারি ও খুলনা অঞ্চল পরিচালক মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক, সাতক্ষীরা-৩ আসনে সাবেক জেলা আমির ও খুলনা অঞ্চল টিম সদস্য মুহাদ্দিস রবিউল বাশার এবং সাতক্ষীরা-৪ আসনে সাবেক সংসদ সদস্য ও জেলা কর্মপরিষদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের নাম ঘোষণা করা হয়।
চারটি আসনের প্রার্থীদের হাতে নির্বাচনী প্রতীক দাঁড়িপাল্লা তুলে দিয়ে উপস্থিত জনতাকে তাদের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। জেলা জামায়াতের আমির উপাধ্যক্ষ শহিদুল ইসলাম মুকুল অতিথিদের পরিচয় করিয়ে দেন।
জেলা জামায়াতের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ নির্বাচনী সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীসহ জোটভুক্ত শরিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।


